একুশতম অধ্যায় বেদনার দিন
এই ছেলেটি, যাকে সবাই পত্রপাত বলে ডাকে, তাকে নিয়ে কী বলব! ছোটবেলা থেকেই ওর বয়স খুব বেশি না হলেও, ছেলেটি বরাবরই ভীষণ শান্তশিষ্ট, কখনোই কান্নাকাটি বা চিৎকার-চেঁচামেচি করত না। বলা যায়, যেন সে পরিবারের ঋণ শোধ করতেই জন্মেছে। যদিও এতে কিছুটা স্বস্তি ছিল, তবুও অনেক সময় এমনও হয়েছে, যখন ওর কারণে বড় দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে আমাদের।
ঠিক যেমন এখন, পত্রপাত আবার নতুন কাণ্ড শুরু করেছে। এই ছেলেটি সাধারণত মেয়েদের মতো শান্ত, কিন্তু যখনই ও অস্বস্তি বোধ করে বা কান্নাকাটি শুরু করে, তখন বুঝতে হয়, ব্যাপারটা আর ছোটখাটো নয়, বড় কোনো সমস্যা হয়েছে, যা শুধু আমাদের দুইজনের পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়।
প্রায়ই দেখা যেত, পত্রপাত যখনই চুপচাপ না থাকে, তখনই বোঝা যেত, সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওর এই কান্নাকাটি কয়েকদিন ধরে চলত এবং সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার ছিল, সাধারণত রাতে এসব শুরু হতো। তাই মাঝরাতে ওকে কোলে নিয়ে ছুটতে হতো গ্রামের ছোট ক্লিনিকে। এটা কোনো বড় হাসপাতাল ছিল না, আমাদের নিজের গ্রামেই ছোট্ট একটি চিকিৎসাকেন্দ্র।
এই ছোট্ট ক্লিনিকটিকে অবহেলা করার কিছু নেই, কারণ গ্রামের মানুষের জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে ভরসার জায়গা। মাথাব্যথা, জ্বর, কাশি—সবকিছুতেই এখানে আসতে হতো। বড় হাসপাতালে গেলে তখন একমাত্র বাহন ছিল সাইকেল। আর যদি কাউকে শহরে নিয়ে যেতাম, তখনও পৌঁছানোর আগেই রোগী হয়তো পথেই কাহিল হয়ে পড়ত, এতটাই কঠিন ছিল সে সময়ের বাস্তবতা।
ভাগ্য ভালো, ক্লিনিকের ডাক্তার তখন মোটামুটি ভালোই ছিলেন। অন্য অনেক গ্রামের মতো নয়, যেখানে ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় প্রাণহানির খবর পাওয়া যেত। এগুলো কোনো গুজব ছিল না, কারণ পত্রপাত পরে নিজের চোখেই এমন অনেক ঘটনা দেখেছে।
এটা ছিল সেই সময়ের দোষ, চিকিৎসাবিদ্যার পিছিয়ে পড়া ছিল মূল কারণ, এক-দুইজনের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই; এতো বড় বোঝা তারা বইতে পারবে না।
পত্রপাতের ঘনঘন অসুস্থ হওয়া আর হাসপাতালে যাওয়া, যেন হাসপাতালটাই ওর নিজের বাড়ি হয়ে উঠেছিল। দুদিন পরপরই ওকে নিয়ে দৌড়াতে হতো, এতে পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন আরও বেড়ে গিয়েছিল।
সেই সময়টায়, দেশের সার্বিক উন্নয়ন না থাকায়, পুষ্টি আর চিকিৎসা—কিছুই ঠিকমতো জুটত না। তার ওপর, পত্রপাত জন্মগতভাবে দুর্বল ও রোগাক্রান্ত ছিল। তাই সবাই ধীরে ধীরে ওকে নিয়ে আর আশা রাখত না। অনেকেই বলত, ও বাঁচবে না, মাঝপথেই হয়তো চলে যাবে।
অনেকেই পত্রপাতের মা-বাবাকে বলত, মন শক্ত করো। কিন্তু তারা এসব কথায় কখনো কান দিত না। বিশ্বাস করত না, ভাবতেও চাইত না। শেষ পর্যন্ত, এটা তাদের নিজের রক্ত-মাংসের সন্তান, শুধু কথার ছলে হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না, যত কষ্টই হোক, লড়ে যেতে হবে।
শেষে যদি সত্যিই সে আমাদের ছেড়ে চলে যেতেও হয়, তাহলে সেটা বাবার দায়, নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা—এটা সন্তানের দোষ নয়।
ভাগ্যক্রমে, সেই সবচেয়ে খারাপ আশঙ্কা সত্যি হয়নি। ক্লিনিক আর বাড়ির মাঝের যাতায়াতেই পত্রপাত একটু একটু করে বড় হতে থাকে।
যদিও তার শরীর তখনও তেমন ভালো ছিল না, কিন্তু শুরুর সেই ভয়াবহ দুরবস্থার মতো আর ছিল না। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা একটু একটু করে বাড়ছিল। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে, ওর রোগপ্রতিরোধ খুবই দুর্বল ছিল, তাই একটু অসাবধানতায়ও বড় বিপদ হয়ে যেত।
আর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এমন একটা জিনিস, যেটা সহজে বাড়ানোর উপায় নেই। এজন্যই পত্রপাতকে বরাবর অনেক ভালোবাসা আর যত্নে রাখতে হতো।