চতুর্তচল্লিশতম অধ্যায় অফিসের মধ্যে জীবিত যারা (২)
তবুও শাও লান পাশের ঘরের কর্মচারীর কথা ভাবছিলেন, দৃষ্টি বারবার অস্থির দেওয়ালের দিকে চলে যাচ্ছিল। দেখতে পেলেন, লিউ থিয়ানলিয়াং ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে। তিনি অকপটে লিউ থিয়ানলিয়াংয়ের পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করলেন, নিজের ছোট্ট মুখে ধরিয়ে জ্বালালেন, তারপর ধীরে ধীরে তা ওর মুখে গুঁজে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘‘হয়ে গেছে, একটা সিগারেট খাও, এবার ওঠো। পুরুষমানুষ হয়ে সারাজীবন দিদির বুকে শুয়ে থাকতে চাও নাকি?’’
‘‘ধন্যবাদ শাও লান, অনেকদিন পর আবার এমন অনুভূতি পেলাম... ছোটবেলায় মায়ের কোলে শুয়ে থাকতাম যেমন...’’
লিউ থিয়ানলিয়াং ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসলেন, এখনও কিছুটা আতঙ্কিত, তবে শাও লানের দিকে চেয়ে তার চোখে গভীর কৃতজ্ঞতা ছিল। আর শাও লান মুখ চেপে হেসে উঠলেন, ছলনাময়ী স্বরে বললেন, ‘‘হতে পারে, তুমি চাইলে আমি তোমার মা-ও হয়ে যেতে পারি, শুধু দুধ খাওয়াতে পারব না।’’
শাও লান এই কথা বলেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠলেন, বিব্রতবোধ নিয়ে মাটিতে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘‘চল ওঠো, এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। আগে টিউবের ভেতরের জীবিত লাশগুলো পরিষ্কার করো, লোকগুলোকে বাঁচানোই এখন জরুরি।’’
‘‘ওই টিউবের ভেতরে ওটা জীবিত লাশ না, মনে হয় মৃতদেহ। চেহারা আবার বেশ চেনা চেনা লাগছে...’’
লিউ থিয়ানলিয়াং মাটিতে উঠে দাঁড়ালেন, সিগারেট থেকে এক টান নিলেন, কিন্তু তাতে কোনো প্রশান্তি খুঁজে পেলেন না। কপালে ভাঁজ পড়ল, ছাদের দিকের পাইপের দিকে মনোযোগ দিলেন। হঠাৎ মাথায় হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘ধুর! মনে পড়েছে, ওটা তো চেন গোয়োঝু! ওর মত লোক এখানে এসে মরলো কীভাবে?’’
‘‘চেন গোয়োঝু? ওই যে গলায় ট্যাটু-ওয়ালা ঠিকাদার? আমাদের তো ওর সঙ্গে অনেক আগেই যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে। সে কেন আমাদের কোম্পানিতে এল?’’
শাও লানও একটু কপাল ভাঁজ করলেন, মনে মনে এক চতুর বুড়ো গুন্ডার ছবি ভেসে উঠল। লিউ থিয়ানলিয়াং কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘‘বলতে পারি না, হয়তো কেউ গোপনে ওকে কাজ দিয়েছিল। তবে, ওর মৃত্যু মন্দ হয়নি। ওটা একটা যন্ত্রণা ছিল। তুমি দেখো, সারাদিন হাসিমুখে ঘুরে বেড়াত, অথচ আড়ালে নানান কুকর্ম করত। ওর মৃত্যুতে কতজন যে বাজি ফাটাবে কে জানে!’’
‘‘ছাড়ো ওর কথা। সমাজের এমন বিষবৃক্ষ যত তাড়াতাড়ি যায় তত ভালো।’’
শাও লান অবজ্ঞার ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন, একফোঁটাও সহানুভূতি দেখালেন না। তারপর লিউ থিয়ানলিয়াংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু দ্বিধায় বললেন, ‘‘লোকগুলোকে বাঁচাতে পারবে তো? যদি খুব কঠিন মনে হয়... আমরা ছেড়ে দিতে পারি।’’
‘‘চেষ্টা করে দেখি। এতদূর এসে আর পিছিয়ে যাবো কেন! তবে তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দাও। যদি বেশি আওয়াজ হয়, জীবিত লাশগুলো টেনে আনবে, তখন মুশকিল হবে।’’
লিউ থিয়ানলিয়াং মুখ থেকে সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে শাও লানের দিকে তাকালেন। শাও লান মাথা নাড়লেন, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আর লিউ থিয়ানলিয়াং নিরুপায় হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা চেয়ারটা তুলে টেবিলের ওপর রাখলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার উপরে উঠলেন।
লিউ থিয়ানলিয়াং সাবধানে মাথা বাড়িয়ে ছাদের টিউবের ভেতর দেখলেন, আলো ফেলে মৃতদেহটি পর্যবেক্ষণ করলেন। নিশ্চিত হলেন, ওটা জীবিত লাশ নয়, নিস্তেজ হয়ে মুখ হা করে আছে, মুখের কোণে জমাট বেঁধে থাকা ময়লা। কিন্তু লিউ থিয়ানলিয়াং তোয়াক্কা করলেন না, সঙ্গে সঙ্গে স্টিলের পাইপ ঢুকিয়ে মৃতদেহের মাথা বিদ্ধ করলেন, যাতে হঠাৎ জীবন্ত লাশে পরিণত হয়ে তাকে কামড়ে না ফেলে!
চেন গোয়োঝু অনেকক্ষণ আগেই মারা গেছে, মাথা ফুটো করার পর সামান্য রক্ত আর মগজ বের হলো। লিউ থিয়ানলিয়াং দেহের ভঙ্গি দেখে অনুমান করলেন, সেও টিউব দিয়ে পালাতে চেয়েছিল, কিন্তু মাঝপথে আটকে গিয়ে মারা গেছে। মনে মনে স্বস্তি পেলেন, নিজে টিউবের মধ্যে ঢুকে ঝামেলা করেননি— নাহলে চেন গোয়োঝুর মত পরিণতি হত!
‘‘ওই! কেউ আছো? একজন উপরে উঠে এসে আমার সঙ্গে কথা বলো!’’
লিউ থিয়ানলিয়াং টিউবে মুখ গুঁজে চিৎকার দিলেন। জীবিত লাশেরা তাঁর ডাকে আসবে বলে ভয় পাননি, কারণ এই টিউব একাধিক পথে ছড়ানো, ওদের তো বোঝার সাধ্য নেই আওয়াজটা কোন দিক থেকে এল!
‘‘আছি আছি! ভাই, আমাদের বাঁচাও...’’
আরও অপেক্ষা করতে হল না, চোখের পলকে উল্টো দিক থেকে অসীম আনন্দে সাড়া এল। তবে পুরো টিউব চেন গোয়োঝুর দেহে ঠাসা, অন্যপাশের আওয়াজও ঢিমে, পানির নিচে কথা বলার মত। লিউ থিয়ানলিয়াং কান পেতে বোঝার চেষ্টা করলেন, কী বলছে।
তিনি আবার স্টিল পাইপ ঢুকিয়ে মৃতদেহটা ঠেলতে চাইলেন, দেখে নিলেন, ওর কোমর ঝামেলায় আটকে আছে, তাই টিউবের ভেতর আটকে গেছে। নাহলে ওর শুকনো-পাতলা গড়নে হয়তো বেরিয়ে আসত। তাই চিৎকার করলেন, ‘‘তোমরা কয়জন? কেউ গুরুতর আহত?’’
‘‘ছয়জন! আমাদের একজনের পা ভেঙে গেছে, আর দেরি হলে বাঁচবে না, দয়া করে আমাদের দ্রুত উদ্ধার করো...’’
ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ করুণ আর তাড়াহুড়োর কণ্ঠ এলো। লিউ থিয়ানলিয়াং ধীরে ধীরে বললেন, ‘‘চিন্তা করো না! এই টিউবই তোমাদের বাঁচার রাস্তা। তবে এর মধ্যে একটা মৃতদেহ আটকে আছে, তোমাদের একজনকে এখানে আসতে হবে, যাতে আমরা একসঙ্গে ঠেলে ওকে বের করতে পারি!’’
‘‘না ভাই! আমরা ছয়জন পুরুষ কেউই ঢুকতে পারিনি। মৃতদেহটা চেন গোয়োঝু স্যারের, তিনি গতকাল ঢুকেই আটকে গেছেন, আমরা তো আরও পারবো না...’’
ওপাশ থেকে কান্নাজড়ানো কণ্ঠ এল, আবার বিভ্রান্তি আর আতঙ্ক ভরা। লিউ থিয়ানলিয়াং নির্বিকার বললেন, ‘‘তাহলে একজন মেয়েকে পাঠাও, ঠেলা দিলে হয়তো বেরিয়ে যাবে, না বেরোলে মরেই যাবে। দরজার বাইরে পঞ্চাশ-ষাটটা জীবিত লাশ দাঁড়িয়ে আছে, আমি এতটুকু করেই যথেষ্ট সহানুভূতি দেখালাম!’’
‘‘তোমরা...তোমরা কি পুলিশ নও?’’
ওপাশ থেকে সন্দেহভরা প্রশ্ন। লিউ থিয়ানলিয়াং হেসে বললেন, ‘‘ভীষণ বোকা তো! পুলিশ হলে এমন পদ্ধতিতে উদ্ধার করত? গুলি ছুড়েই ঢুকে পড়ত। বাজে কথা ছাড়ো, তাড়াতাড়ি কাউকে পাঠাও, পারবে কিনা, সেটা তোমাদের কপাল!’’
‘‘আচ্ছা আচ্ছা...আমরা এখনই কাউকে পাঠাচ্ছি...’’
তৎক্ষণাৎ ওরা রাজি হয়ে গেল, যেন ভয় পাচ্ছে লিউ থিয়ানলিয়াং ছেড়ে চলে যাবেন। কিছুক্ষণ পরই টিউবের মধ্যে শব্দ হল, সঙ্গে ভীত কন্ঠে এক মেয়ের চিৎকার, ‘‘ভাই...আমি...আমি মৃতদেহের পেছনে আছি, এবার কী করব?’’
‘‘তোমার মোবাইল আছে? আগে মোবাইলের আলো দিয়ে দেখো, মৃতদেহটা কোথায় আটকে আছে!’’
লিউ থিয়ানলিয়াং চিৎকার করে বললেন। শুনে বোঝা গেল, মেয়েটি বেশ তরুণী, কণ্ঠে কোমলতা। সে সাড়া দিয়ে আবার বেরিয়ে গেল ফোন খুঁজতে। দু’মিনিট পর মৃতদেহের কিনারায় আলো দেখা গেল, মেয়েটি ভেতরে নাড়াচাড়া করে আবার চিৎকার করল, ‘‘ওর কোমর পুরোপুরি জোড়ার স্থানে আটকে গেছে, বেল্ট আর জিন্স স্ক্রুতে আটকে আছে, আমার হাত ঢুকছে না!’’
‘‘শোনো, একটা কাঁচি বা ছুরি খুঁজে আনো, ওর প্যান্ট মাঝ থেকে কেটে দাও। ও তো মরেই গেছে, আঘাত লাগলে ভয় নেই, যতটা পারো কেটে দাও। তারপর আমার নির্দেশ মেনে ওকে ঠেলো, আমি বাইরে থেকে টানবো, বুঝেছো?’’ —লিউ থিয়ানলিয়াং দ্বিধাহীনভাবে বললেন।
‘‘বুঝেছি...আমি যাচ্ছি...’’
মেয়েটি বলেই আবার বেরিয়ে গেল। লিউ থিয়ানলিয়াং হাতে থাকা স্টিল পাইপটা ওজন করলেন, মৃত চেন গোয়োঝুর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, ‘‘মাফ করো পুরনো চেন, লোকজন বাঁচাতে তোমার রক্ত ঝরাতে হচ্ছে। সেদিন আমার সঙ্গে স্নান করতে গিয়েছিলে, ভুলব না। যদি বেঁচে ফিরি, তোমার জন্য বড় দুধওয়ালা সুন্দরী পাঠাবো, তোমার তো ওই রকমই পছন্দ, বদলা চাইলে আমার কাছে এসো না, বাইরে এত জীবিত লাশ, যেকোনো একটাকে ধরো!’’
নিজের মনে বিড়বিড় করে আবার স্টিল পাইপ ঢুকিয়ে এক দমে মৃতদেহের বুকে আঘাত করলেন। ‘‘পুচ-পুচ’’ শব্দে মৃতদেহের নিচ থেকে কালচে আঠালো তরল গড়িয়ে পড়ল। ওগুলো রক্ত কিনা নিশ্চিত নন, তবে বেরিয়ে এসে মৃতদেহের আকার ছোটাবে, টেনে বের করতে সুবিধা হবে।
মেয়েটিও দ্রুত ফিরে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেতর থেকে ওর হাঁপানোর শব্দ শোনা গেল। লিউ থিয়ানলিয়াং শুনে মনে হল, যেন কারো মোলায়েম হাত বুকের ওপর খেলা করছে, গা শিরশিরে লাগল।
তবুও বেশি সময় নষ্ট করার ঝুঁকি নিলেন না, এখানে এক মিনিট বেশি মানেই বিপদ আরও বাড়বে। তার মুখের লাজুক হাসিটা গুমিয়ে গেল, মাটিতে পড়ে থাকা রক্তমাখা কয়েকটা বেল্ট কুড়িয়ে মুছলেন, সেগুলো গিট দিয়ে জুড়ে নিলেন। তারপর আবার টিউবে ঢুকে মৃতদেহের গলায় প্যাঁচিয়ে দিলেন। নীচে নেমে শক্তি পরীক্ষা করলেন, মনে হল ঠিক আছে। এবার মেয়েটিকে চিৎকার করে বললেন, ‘‘তৈরি তো? আমি এক-দুই-তিন গুনবো, তখন ঠেলো! এক, দুই, তিন... ঠেলো!’’
‘‘গুদং!’’
লিউ থিয়ানলিয়াং জোরে টান দিতেই মৃতদেহ বেরোল না, বরং টিউবটাই একপাশে হেলে পড়ল, ওপরের দুইটা স্ক্রু ছিঁড়ে ‘‘খলখল’’ শব্দে মাটিতে পড়ল। চমকে উঠলেন তিনি, মেয়েটিও ভেতরে চিৎকার করল!
‘‘কিছু হবে না! ভয় পেও না, টিউব যদি ভেঙে পড়ে, তোমরা বরং সহজেই বেরিয়ে আসতে পারবে!’’
লিউ থিয়ানলিয়াং হতবাকভাবে মাথা নাড়লেন। ভাবেননি এই ভেন্টিলেশন টিউব এতই নড়বড়ে; এতক্ষণ ধরে পানশান দিয়ে খুলতে এত কষ্ট করছিলেন। তবে এতে বরং সুবিধা হল, এবার মাটিতে দাঁড়িয়েই টিউবের অবস্থা দেখতে পাচ্ছিলেন। অনুমান করলেন, মেয়েটি পুরো দেহ নিয়ে মৃতদেহের ওপর চেপে আছে, চেন গোয়োঝুর মৃত মুখটা টিউবের গায়ে চ্যাপ্টা হয়েছে। লিউ থিয়ানলিয়াং হাত ঘষে আবার শক্তি নিয়ে বেল্ট টেনে দিলেন।
‘‘ছ্যাঁদা’’ শব্দে মৃতদেহের প্যান্ট ছিঁড়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহটা উল্টে টিউব থেকে নিচে পড়ে গেল। প্রস্তুত লিউ থিয়ানলিয়াং ফুর্তিতে বেল্ট ছেড়ে দিয়ে সরে গেলেন, মৃতদেহটা পড়ে রইল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সাদা পোশাকে ভয়ানক চিৎকারে এক মেয়ের শরীর পড়ে এল, আতঙ্কে টিউব থেকে গড়িয়ে পড়ল। লিউ থিয়ানলিয়াং সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে গিয়ে তাকে শক্ত হাতে ধরে ফেললেন!