বাহাত্তরতম অধ্যায়: বজ্রদেবতার বন্দিত্ব
জেন ফস্টার সূর্যাস্তের শেষ আলোয় তাকিয়ে, গাড়িবহর যে দিকে চলে গেল সে দিকে হতাশ দৃষ্টিতে বলল, ‘‘সব শেষ, আমার এত বছরের গবেষণা...’’ ডেইজি-ও সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘‘ওরা আমার কম্পিউটারটাও নিয়ে গেছে।’’
‘‘তোমার কাছে কোনো ব্যাকআপ নেই?’’ সেলভিগ প্রফেসর জিজ্ঞেস করলেন।
জেন ফস্টার একেবারেই উদাসীন, ‘‘কিছুই নেই, সব নিয়ে গেছে, এমনকি ব্যাকআপেরও ব্যাকআপ কেড়ে নিয়েছে। ওরা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছে।’’
ডেইজি আবার অভিযোগ করল, ‘‘আমি তো ত্রিশটা গান ডাউনলোড করেছিলাম, সেগুলোও গেল।’’
‘‘তুমি কি পারো না একটু কম্পিউটার নিয়ে কথা না বলতে?’’ জেন ফস্টার বিরক্ত হয়ে বলল, ‘‘এখন এসব বলার সময় নয়।’’ তারপর সেলভিগের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘‘ওরা কারা?’’
সেলভিগ প্রফেসরের চোখে দুঃখের ছায়া, ‘‘আমার এক বন্ধু আছে, সে গামা রশ্মি নিয়ে গবেষণা করত। ওদের সংস্পর্শে আসার পর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’’
কিন্তু সেলভিগ প্রফেসরের কথায় জেনের বিশেষ ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
‘‘ওরা আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে না। আমাদের গবেষণার কাগজপত্র ফেরত আনতেই হবে,’’ জেন ফস্টার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল।
সেলভিগ তখন কিছুটা চিন্তিত, সবসময় সে-ই জেনের দেখাশোনা করত, তাঁদের সম্পর্ক অনেকটা বাবা-মেয়ের মতো। ‘‘এক মিনিট অপেক্ষা করো, আমি আমার এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। সে শিল্ড সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল, হয়তো কিছু করতে পারবে।’’
কিন্তু জেন আর অপেক্ষা করল না, সে ঘুরে চলে গেল।
সে দ্রুতই পশুর দোকান থেকে ছাগল কিনতে যাওয়া থরের কাছে পৌঁছায়, দু’জনে একসঙ্গে রওনা দেয় পশ্চিমে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে।
গন্তব্যে পৌঁছে, থর চুপিচুপি ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে, জেনকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই, থরকে ফেলে দেওয়া হয়; গুপ্তচররা তাকে ধরে ফেলে এবং সে চোরাগোপ্তা প্রবেশ থেকে জোরপূর্বক প্রবেশে রূপান্তরিত হয়।
গুপ্তচররা পেশাদার হলেও, দেড় হাজার বছর বেঁচে থাকা থরের যুদ্ধশক্তি এবং অভিজ্ঞতা তাদের চেয়ে অনেক বেশি; তার শক্তিশালী শরীর নিয়ে সে যেন এক বিশাল ষাঁড়ের মতো সবকিছু ভেঙে এগিয়ে যায়।
বাজপাখি নামের গুপ্তচরটি উপরে দাঁড়িয়ে তীর-ধনুক তাক করে।
‘‘আমি কি তাকে শেষ করব, নাকি আরও অনেক সৈন্য পাঠিয়ে জোর করে ধরব?’’
দিনের বেলায় মাইকেল বলেছিল, সে আসবেই; ভাবা যায়, সত্যিই সে এসেছে।
‘‘আরও একটু অপেক্ষা করি, দেখি সে কী চায়।’’
আকাশ যেন থরের মনের অবস্থা প্রতিফলিত করল, হঠাৎ বৃষ্টি নামল।
কোলসন ইচ্ছাকৃতভাবে সহজ সুযোগ করে দিলে, থর অবশেষে তার প্রিয় হাতুড়ির কাছে পৌঁছায়।
ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে, থর হাত বাড়িয়ে তার সবচেয়ে ভালোবাসার হাতুড়ির দিকে এগোয়।
হাতুড়ি তুলতে পারলেই সে আবার আসগার্ড ফিরে যেতে পারবে।
উদ্বেলিত হৃদয়ে থর হাত বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু এই মুহূর্তে, তার মধ্যে সেই গুণাবলি নেই যা থরের হাতুড়ি তুলতে প্রয়োজন।
থর মনে করল, এ তার পিতার ইচ্ছা; তার পিতা এখনও তাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত নন—এ ভাবনা থরকে চরম হতাশায় ডুবিয়ে দেয়।
ভগ্ন হৃদয়ে, থর মাটিতে হাঁটু গেড়ে চিৎকার করে ওঠে, এমনকি গুপ্তচররা যখন তাকে বেঁধে ফেলে তখনও সে কিছুই অনুভব করে না।
মাইকেল একবার থরের দিকে তাকিয়ে কোলসনকে বলল, ‘‘তার কিছু রক্ত, টিস্যু, আর কিছু চুল সংগ্রহ করো।’’
‘‘সব চুল?’’
‘‘না, শুধু মাথার চুলই যথেষ্ট।’’
বলেই মাইকেল ঘুরে চলে গেল।
বৃষ্টিতে ভিজে কোলসনের পাশে থাকার ইচ্ছে তার ছিল না, সে গরম পানি দিয়ে স্নান সেরে থরের রক্ত পরীক্ষা করতে লাগল।
পরদিন, কোলসন হতবাক হয়ে থরের দিকে তাকিয়ে ছিল—যেন তার প্রাণহীন দেহ।
সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চায় না যে ঈশ্বর বলে কিছু আসলেই আছে; উপরন্তু, থরের বলা কথাগুলো তো সবার জানা পৌরাণিক কাহিনি ছাড়া আর কিছুই নয়।
এসব কথা কে-ই বা বিশ্বাস করবে?
একজনও না।
পুরোপুরি বাজে কথা।
কোলসন সিদ্ধান্ত নিল, এবার ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
‘‘তুমি আমার অধীনে লোকদের সস্তা নিরাপত্তারক্ষী বানিয়ে দিলে, এতে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আমার জানা মতে, শুধু প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই এমন দক্ষতা দেখাতে পারে। কেন বলো না, তুমি কোথায় প্রশিক্ষণ পেয়েছ?’’
‘‘পাকিস্তান, চেচনিয়া, আফগানিস্তান।’’
‘‘না, আমি বরং মনে করি তুমি একজন ভাড়াটে সৈন্য।’’
‘‘কোথায়? আমার জানা মতে অনেক সংস্থা তোমার মতো লোকদের নিয়োগ করে।’’
‘‘তুমি কে?’’
কোলসন যতই প্রশ্ন করে, থর নির্বিকার।
কারণ সহজ: এখনো থর বুঝতে পারে না ‘গুপ্তচর’ কী, কোলসন আসলে কী জানতে চায় তাও তার স্পষ্ট নয়।
সরলভাবে বললে, দু’জনের কথোপকথন যেন একেবারে অযৌক্তিক।
তার ওপর, বজ্রের দেবতা একজন সাধারণ মানুষকে সময় দিতে চায় না, ফলে কোলসনের একক নাটক হয়ে দাঁড়ায়।
মাইকেল পাশে এসে একটা চেয়ারে বসল, বলল, ‘‘হতে পারে সে সত্যিই আসগার্ড থেকে এসেছে। তার কোষের ঘনত্ব সাধারণ মানুষের তিনগুণ, তাই তার শক্তি ও বিস্ফোরণশক্তিও অনেকগুণ বেশি। তার ওজনও তাই হওয়াই স্বাভাবিক।’’
‘‘তার জিনের বিন্যাসও সাধারণ মানুষের মতো নয়, ভেতরে কোনো এক্স-জিন নেই, যা মিউট্যান্টদের থাকে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলতে গেলে, সে মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত নয়।’’
কোলসন বিস্মিত, ‘‘কি বলছেন? মাইকেল, আপনি কি মজা করছেন?’’
একজন জীবিত মানুষ সামনে বসে, অথচ আপনি বলছেন সে মানুষ নয়!
‘‘আমি মজা করছি না। আসলে, সে মানবজাতির কেউ নয়। মানব হলে, সে পৃথিবীর মানুষ নয়।’’
অবশেষে থর কথা বলল।
‘‘হ্যাঁ, আমি মানুষ নই। আমি বজ্রের দেবতা থর, আসগার্ড থেকে আগত।’’
বজ্রের দেবতা কোলসনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘আসগার্ড কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং দেবতাদের আবাসস্থল, দেবরাজ্যের নাম।’’
কোলসনের মুখে আরও বিস্ময়, সে মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘ডাক্তার, আপনি কি সত্যিই এসব বিশ্বাস করেন?’’
মাইকেল নির্বিকার, ‘‘বিশ্বাস করি, এমনকি জানি কিছুক্ষণের মধ্যে কৌশলের দেবতা লোকিও এখানে আসবে।’’
‘‘কি বললেন?’’
কোলসন চমকে উঠল, আপনি কি সত্যিই ঠাট্টা করছেন না?
‘‘আপনি লোকিকে চেনেন?’’
থর নিজেও কিছুটা অবাক।
‘‘হ্যাঁ, সে তোমার ভাই, ভালোবাসার অভাবে ভোগে। তোমার পিতা ওডিন, মাতা ফ্রিগা।’’
‘‘তুমি কি কখনো দেবরাজ্যে গিয়েছিলে?’’ থর বিস্মিত হয়ে মাইকেলের দিকে তাকাল, যেন পরিচিত কাউকে খুঁজে পেয়েছে।
মাইকেল হেসে বলল, ‘‘না, আমি কেবল একজন জাদুকর।’’
এক ঝটকায় হাতে একটি ঢাল তৈরি করল।
থর বিস্মিত, ‘‘ওহ, পৃথিবীতেও পুরুষ জাদুকর আছে।’’
‘‘পুরুষ জাদুকর নয়, আমি জাদুশিল্পী,’’ মাইকেল বলল, ‘‘আমরা শ্বেত জাদু শিখি, যা বিশেষভাবে অন্ধকার জাদু ও ভিন্ন মাত্রার অধিপতিদের মোকাবেলার জন্য ব্যবহার হয়। আমরা না পুরুষ, না নারী জাদুকর।’’
কোলসন প্রথমে ভাবছিল, এ বুঝি দু'জন পাগলের বৈঠক, কিন্তু মাইকেল যখন সত্যিই জাদুর ঢাল দেখাল, তখন জীবনটাই তার কাছে অবাস্তব ঠেকল।
‘‘আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, তোমরা কথা বলো।’’
এবার কোলসন বুঝল, কেন নিক ফিউরি মাইকেলকে এখানে পাঠিয়েছে—কারণ সে-ই আসল বিশেষজ্ঞ।
মাইকেল থরের দিকে তাকিয়ে, এক ঝটকায় দুটি বিয়ার বের করে, একটি থরের হাতে দিল।
‘‘তুমি কি তোমাদের নিয়ে একটু কথা বলতে পারো? যেমন, লোকি, হেইমডাল, দেবরাজ্যের সৈন্য, কিংবা অন্যান্য রক্ষকরা।’’
‘‘নিশ্চয়ই।’’
থর এক চুমুক বিয়ার খেয়ে গল্প শুরু করল।
প্রথমেই সে লোকির কথা বলল। মাইকেল মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে, যাতে সে আরও বেশি বলে।
অন্যদিকে, কোলসন পাশের অফিসে বসে মনিটরে নজর রাখছিল, কী ভাবছিল তা কেউ জানে না।