অধ্যায় ১১: পাঁচ স্বাদের পায়েস (২)

অলৌকিক প্রাণীর ভোজনালয় ত্রৈগুণ্যহীন কুটিরের অধিপতি 4365শব্দ 2026-03-05 01:10:44

পনেরোই শ্রাবণের রাত। মহামহোপাধ্যায় মুদ্গল মহাশয় উলম্বন উৎসবের আয়োজন করেন, পিতৃপুরুষ ও অকালপ্রয়াত আত্মাদের শান্তির জন্য এবং নদীতে প্রদীপ জ্বালিয়ে সকলকে মুক্তির আশীর্বাদ দেন। সে রাতে ভূতপ্রেতেরা পাতালপুরী থেকে উঠে এসে, দলবদ্ধভাবে নির্জন প্রান্তরে আলো-চাঁদের নিচে ঘুরে বেড়ায়—একে ডাকা হয় ভূতসমাবেশ—রাত পেরুলেই ফিরে যায় আপন জগতে।

একটি রাত জেগে কাটিয়ে চারিলাল মশাই গাড়িতে উঠেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ভোরে জেগে দেখেন, তিনি আবার সুপরিচিত ‘রসনার সভায়’ ফিরে এসেছেন।

চোখ মেলেই তিনি জুতো পরার তোয়াক্কা না করে খালি পায়েই দৌড়ে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে উঁকি দিলেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন—গতরাতে যে সোনালী-রৌপ্যাভাসে ঝলমল রাজপ্রাসাদ পথচারীদের চমকে দিয়েছিল, সেটি কোথাও নেই।

ভোজনরসিক বাহির থেকে ফিরে তাড়াতাড়ি রক্তের গন্ধ ধুয়ে নিজের ছোট শেয়ালটিকে দেখতে এলেন। দরজা ঠেলে ঢুকেই দেখলেন, চারিলাল খালি পায়ে নীল ইটের মেঝেতে দাঁড়িয়ে। কপালে ভাঁজ পড়ল—তিনি এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিলেন, বললেন, ‘‘জুতো না পরে দৌড়চ্ছ কেন?’’

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা হুয়ান ও চিংসি তাঁকে কপাল কুঁচকাতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইল, ‘‘আমাদের দোষ, ছোট সাহেব, দয়া করে শাস্তি দিন।’’

ভোজনরসিক, যিনি প্রাচীনকালের তিন মহাদানবের একজনের সঙ্গে তুলনা পাওয়ার যোগ্য, আদতে খুব একটা সজ্জন নয়। ছোটখোকা ভেবে অনেকে ভাবত, তিনি খুব কোমল ও প্রেমময়, কিন্তু ভুল করলে আজও কেউ কেউ জানে না, তাদের আত্মা কোথায় যন্ত্রণা পাচ্ছে। এই ভোজনরসিক কিন্তু অত সহজ নয়—রাগলে হয় উড়িয়ে দেবেন, নয় গিলে ফেলবেন; কিন্তু ছলনা করলে মৃত্যুর চেয়েও করুণ অবস্থা হবে।

চারিলাল কোলে উঠে তাঁর পা ধরতেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিলেন, হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘ছাড়ো, ছাড়ো, খুব গুদগুদে লাগে। চিংসির কী দোষ? আমি শেয়াল থাকাকালীন তো পাহাড় জঙ্গল ছুটে বেড়াতাম, তখন তো কখনও আমাকে পায়ে জুতো পরিয়ে দিলে না!’’

ভোজনরসিক হাসিমুখে ওর যুক্তিহীন কথা শুনলেন।

চিংসি ও হুয়ান এখনও হাঁটু গেড়ে, মাথা নিচু করে বসে রইল—তাঁরা অনুমতি না পাওয়া অবধি উঠবেন না।

চারিলাল তখন ভোজনরসিককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘গত রাতে যে সন্ন্যাসী চাঁদের আলো দিয়েছিল, সেটা কোথায়? চিংসি দিদিকে দিয়ে খুঁজে আনো।’’

ভোজনরসিক ওকে কোলে ধরে ওর গোলাপি আঙুলওয়ালা সুন্দর পায়ের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হলেন; দশটি আঙুল যেন ফুলের পাপড়ি, শহুরে মেয়েদের মেহেদি রাঙা নখের চেয়েও সুন্দর। তিনি ওর পায়ে চুমু খেলেন। পরে মাটিতে বসে থাকা দুই ভূতকে বললেন, ‘‘চলো, ওর জন্য খুঁজে আনো। চারিলাল দুর্বল, তোমাদের আরও যত্নবান হতে হবে।’’

চারিলাল মনে মনে বললেন, ‘‘তাঁর মুখের ফুল আর আমার মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য!’’

তবে চিংসি ও হুয়ান দু’জনেই চারিলালের শারীরিক দুর্বলতা বিষয়ে একমত।

চিংসি গেল সেই চাঁদের আলো ভর্তি থলে আনতে। হুয়ান বলল, ‘‘চাইলে চিংয়া পর্বতের গরম জলের উৎস এখানে এনে, ইটের নিচে ভূগর্ভস্থ উষ্ণতা পৌঁছে দিতে পারি। এই ভগ্ন, নির্জীব বাড়িতে ভোজনরসিক থাকছে ভেবে আমার দুঃখ হয়। তবে তিনি তো লোকজনের সেবা পছন্দ করেন না, সবকিছুই মেয়েলি বলে এড়িয়ে যান। ভাগ্যিস, এবার রাজপ্রাসাদ আর সব চাকর ডাকিয়ে এনে আবার ফেরত পাঠালেন, অন্তত আমরাও থেকে যেতে পারলাম—বড়দিদি রেখে যাওয়া স্মৃতি রক্ষা করতে পারছি।’’

চারিলাল শুনে হতবাক—এ কেমন প্রাকৃতিক আধুনিক ভূগর্ভস্থ উষ্ণতা পরিকল্পনা! তবে ভোজনরসিকের মুখে সমর্থন দেখে, তিনি খুব একগুঁয়ে নন—প্রাসাদ সরিয়ে দেওয়াটাই তো বিশাল পাওয়া, উষ্ণ প্রস্রবণ তো অত চোখে পড়ে না!

চিংসি তাড়াতাড়ি সেই ব্যাগটি এনে দিল। গতরাতে ভালোভাবে দেখেননি, এবার লক্ষ করলেন—থলেটি থেকে জ্যোতির্ময় কোমল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ঠিক ভোজনরসিক যে রূপালি চাদরটি দিয়েছিলেন, তার মতো।

চিংসি বোঝালেন, ‘‘ছোট সাহেব, এই সন্ন্যাসী যথেষ্ট মূল্যবান উপহার দিয়েছেন। ব্যাগটি ও আপনার চাঁদের রঙের জামা—দুটোই তৈরি চাঁদের আলোয় জন্মানো রেশমী পোকার সুতোয়। ব্যাগটি পুরোপুরি এই রেশমে বোনা; আর জামাটিতে কিছুটা অন্য সুতো মেশানো। আসলে এই ব্যাগের মূল্য আরও বেশি। এই রেশমী পোকা অত্যন্ত দুর্লভ—এরা কেবল চাঁদের আলো খেয়ে বাঁচে, দশ বছর বড় হতে, একশো বছর লেগে যায় কোকুন তৈরি করতে, আর একবার কোকুন করেই মরে যায়। এই রেশম দিয়ে তৈরি কাপড় শুধু সুন্দরই নয়, চাঁদের আলো জমিয়ে রাখতে পারে; তাই ভূত-প্রেতেরা একে ভীষণ পছন্দ করে—মূল্য নির্ধারণের বাইরে।’’

হুয়ানও বলল, ‘‘আপনি তো স্বর্গীয় শেয়াল, স্বর্গীয় শেয়ালদের চাঁদ উপাসনা করে সাধনা করার রীতি, তাই আপনি সন্ন্যাসীর এ জাদু পছন্দ করেছেন।’’

চারিলালের মুখ পুরো বাঁকিয়ে গেল—তিনি কোনো সাধনা বা স্বর্গীয় শেয়াল হবার কারণে নয়, কেবল রোমান্টিক বলে এ জাদু পছন্দ করেন। ভূত-প্রেতেরা নাকি প্রেমিক ও সরল! কিন্তু যাকেই দেখেন, সবাই কেমন বাস্তববাদী!

তবু মনে মনে ক্ষোভ থাকলেও, চারিলাল এখন একটু চিন্তিত। প্রথমে মনে হয়েছিল, সন্ন্যাসীর জাদু অদ্ভুত; চাঁদের আলো তো তাঁর নিজের, সহজেই দিয়েছেন—একটা খেয়ালি বদান্যতা। এখন বুঝলেন, এত দামী ব্যাগও দিয়ে দিয়েছেন!

তিনি আহাম্মক নন—ভাবলেন, ভোজনরসিককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘এটা দিয়ে তিনি কি কিছু বিনিময় চান?’’ কারণ, রান্না ছাড়া তাঁর কোনো বিশেষ গুণ নেই, চারপাশের সব মূল্যবান বস্তু তো ভোজনরসিকেরই। তাই প্রশ্নটি বেশ অনিশ্চিতভাবে করলেন।

ভোজনরসিক গম্ভীর হলেন না—প্রথম থেকেই তিনি ছোট শেয়ালটিকে উপহার নিতে দিয়েছেন; তাঁর প্ল্যান ছিল। বললেন, ‘‘তিনি চায় কেবল তোমার হাতে রান্না করা পাঁচ স্বাদের পায়েস।’’

চারিলাল অবাক—শোনা যায়, পাঁচ স্বাদের পায়েস নরকের প্রহরীদের ঠকাতে পারে; ক্ষুধার্ত আত্মারা শুধু এটাই খেলে অগ্নি নয়। গত জন্মে তিনি লোকশিল্প ও খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, অনেক অঞ্চলের এ ধরনের কাহিনি জানেন—নাম ভিন্ন হলেও পদটি প্রায় একই রকম। মজার মনে হওয়ায় মনে রেখেছিলেন। কিন্তু এসব তো লোককথা; যদি সত্যও হয়, সন্ন্যাসী কেন পাঁচ স্বাদের পায়েস চাইবেন?

তিনি দ্বিধাভরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তাহলে কি সন্ন্যাসীও কোন দুষ্ট আত্মা?’’ কিন্তু তাতেও সন্দেহ কাটল না; দেখেছেন, সন্ন্যাসী সম্প্রতি মহল্লায় ভিক্ষে করেন, সাধারণ মানুষ তো ভূত দেখতে পায় না, যদি না তাদের সঙ্গে কোনো কার্মিক সম্পর্ক থাকে। এটাই তো নিয়ম—মানুষ যাতে ভূতের উপদ্রব না পায়।

ভোজনরসিক ওর ভাবনা বুঝলেন, ‘‘তুমি ভাবছ, কেন আমাদের ছাড়া অন্য মানুষও সন্ন্যাসীকে দেখতে পায়? শুনো, ক্ষুধার্ত আত্মারা নরকবাসীদের মতো নয়; সাধারণ চোখে নরকের ভূত দেখা যায় না, কিন্তু ক্ষুধার্ত আত্মাদের দেখা যায়।’’

চারিলাল মাথা নেড়ে বুঝলেন। আবার বললেন, ‘‘কিন্তু দেখলাম, তাঁর কিছু অলৌকিক শক্তি আছে; তবু কেন ক্ষুধার্ত আত্মা?’’

ভোজনরসিক খুশি হলেন—নিজের ছোট শেয়াল কত বুদ্ধিমান! কোলে নিয়ে বললেন এক পুরোনো ভূত-প্রেতের গল্প।

একদা এক রানি ছিল, তাঁর রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচলিত। তিনি ছোটবেলা থেকেই মন্দিরে উৎসর্গের জন্য নির্ধারিত ছিলেন। পরে এক ভিন্ন ধর্মের যুবকের প্রেমে পড়ে পালিয়ে যান। বিয়ে করেন, এক পুত্র হয়। কিন্তু মন্দিরের লোকেরা তাঁদের খুঁজে বের করে; ছেলেকে মঠে নিয়ে যায়, স্বামী সাধনা করতে চলে যান, রানি একা হয়ে যান, ধীরে ধীরে কৃপণ, কঠোর ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেন; দাস-দাসীদের মারধর করেন, সন্ন্যাসীদের তাড়িয়ে দেন। জীবদ্দশায় প্রতিদিন পশুহত্যা ও মাংস খেতেন—প্রতিশ্রুতি ভেঙে, সৎকর্ম করলেন না। তাই মৃত্যুর পর পাতালে পড়লেন, ক্ষুধার্ত আত্মা হয়ে জন্ম নিলেন।

সে জগতে, মুখে যা-ই তুলতেন, আগুনে রূপান্তরিত হতো; নদীর দিকে তাকালেই জল শুকিয়ে যেত। আরও ভয়ঙ্কর, তিনি সেখানে শত শত দুষ্ট আত্মার জন্ম দিতেন—এরা বাইরের আত্মাদের গিলে খেত, এমনকি একে অপরকে খেত; কারণ তাদের চিরকাল ক্ষুধার যন্ত্রণা।

ক্ষুধার্ত আত্মাদের আয়ু হাজার হাজার বছর—রানি প্রতিদিন দুঃখ ভোগ করতেন।

তবু, স্বামী ও পুত্র ছিলেন নিষ্ঠাবান। পুত্র পরে বুদ্ধের শিষ্য, মহামহোপাধ্যায় মুদ্গল হন—পনেরোই শ্রাবণের উলম্বন উৎসবও তিনি মায়ের মুক্তির জন্য আয়োজন করেন, যাতে মায়ের পেট ভরে মুক্তি পান।

কিন্তু অন্যের সাহায্যে ফল কাটাতে অনেক সময় লাগে। স্বামী, অশ্বমেধ সাধক, স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে তাঁর জন্য নির্মিত স্তূপ ভেঙে ফেলেন, নিজের পুণ্য ক্ষুধার্ত আত্মা রানি ও তাঁর সন্তানদের দান করেন—এমনকি নিজে ক্ষুধার্ত আত্মা হয়ে পতনের শাস্তি নেন।

এ অবধি শুনে চারিলাল জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তাহলে কি সন্ন্যাসী ঐ অশ্বমেধ সাধক?’’

ভোজনরসিক ওর ঝাঁকড়া মাথায় আদর করে বললেন, ‘‘তুমি সত্যিই বুদ্ধিমান।’’

কিন্তু চারিলাল ধন্যবাদ নিলেন না, বরং দুষ্ট শেয়ালের মতো প্রতিবাদ করলেন, ‘‘আপনি তো ইচ্ছাকৃতভাবে গল্প বললেন—এতে বুদ্ধি কী! আমি ছোটবেলায় বুড়ির মুখে শুনেছি, মহামহোপাধ্যায় মুদ্গল মাকে বাঁচানোর গল্প একেবারেই আপনার মতো নয়!’’

ভোজনরসিক নিজের দানবের শক্তি গোপন করার পর চারিলাল তাকে টাউনের সরল ছেলে ভেবে নির্বিকারভাবে বকুনি দেন।

ফলাফল—ভোজনরসিক ওকে কোলে নিয়ে, বিছানার খোদাই করা স্তম্ভে ঠেসে কানে কানে বললেন, ‘‘কী বললে? রাস্তার বুড়ির কথা মানো, নিজের প্রভুর নয়?’’ কণ্ঠে কুটিল রস।

চারিলাল অনুভব করলেন, কুঁচকি থেকে শুরু করে সারা শরীরে কাঁপুনি উঠছে; যদি তিনি শেয়ালে রূপ নিতেন, গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, ‘‘কিছুই বলিনি…প্রভুর কথা-ই ঠিক, বাইরের গল্পকারেরা মিথ্যা ছড়ায়, সত্য গোপন করে।’’

কিন্তু ভোজনরসিক এসব মানলেন না। ফলে চারিলালকে বিছানায় অনেকক্ষণ ধরে নানা ভাবে শাসন করলেন। এই ভোজনরসিক আগের সেই কোমল প্রেমিকের মতো নন—চারিলাল যতই কাঁদুন, ছাড়েননি।

অবশেষে, শান্তি এলো।

স্নান শেষে ভোজনরসিক নিজে হাতে ওকে জামা পরালেন। শেষে ওর পা ধরে পাহাড়ি মাকড়সীর হাতে বোনা নরম সাদা মোজা পরিয়ে দিলেন।

চারিলাল ক্লান্ত, দুর্বল—নিজেকে অর্ধাঙ্গবিকল সাজিয়ে চুপচাপ সাজতে দিলেন। হঠাৎ মনে পড়ল—জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘সন্ন্যাসী কেন আমার হাতের পাঁচ স্বাদের পায়েস চাইছেন? এমন বিশেষ কিছু তো নয়; স্বাদ ভালো হলেও, অন্য কেউ তো বানাতে পারে! তাছাড়া, আমার পাশে তো আপনি আছেন!’’

ভোজনরসিক কাঠের স্যান্ডেল খুঁজতে খুঁজতে মজা করে বললেন, ‘‘হয়তো তোমার রান্নাই সবচেয়ে সুস্বাদু বলে!’’ আবার চিংসির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘তুমি কী বলো?’’

চিংসি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘‘নিশ্চয়ই! ছোট সাহেবের রান্নার খ্যাতি ভূত-প্রেতের জগতে ছড়িয়ে গেছে।’’ সত্যিই, সবাই বিস্মিত—কী এমন রান্না, যা প্রাচীন দানব ভোজনরসিকের মন জয় করতে পারে!

চারিলাল শুনে মনে হল, কোথাও কেমন খটকা আছে। তবে তাঁর রান্নায় বিশেষ কোনো অলৌকিকতা নেই, জন্মও সাধারণ পরিবারে। এই বিনিময়ে তাঁরই লাভ বেশি। তাই সন্ন্যাসী কেন এত বড় পুণ্য বিনা মূল্যে দেবেন, বুঝলেন না।

তবে তিনি উদারচিত্ত—না বুঝলে ছেড়ে দেন।

এ সময়, পাশে জামা হাতে ছোট ফুলপরি সাহস করে প্রশ্ন করল, ‘‘তাহলে সত্যিই অশ্বমেধ সাধক এক প্রেমিক পুরুষ?’’ ফুলপরির রূপ নেওয়া এখনো নতুন; মেয়েলি মনে গল্প শুনে কেঁদে ফেলল।

চারিলাল যদিও নারী পছন্দ করেন না, নিজেকে পুরুষ ভাবেন; ছোট ফুলপরি সত্যিকারের কোমলমতি মেয়ে বলে, ভবিষ্যতে কোনো ফকির বা দুষ্ট ছেলের পাল্লায় পড়ে যেন না ঠকে, তাই উপদেশ দিলেন, ‘‘হুঁ, যে মুহূর্তে উদাসীনতা এসে পড়ে, ছেলে বাঁচাও বা স্ত্রী বাঁচাও কিছুই মনে থাকে না—সাধু হয়ে বেরিয়ে পড়ে, সে কী প্রেমিক? বরং সে এ সুযোগে ক্ষুধার্ত আত্মাদের শক্তি নিজের দখলে আনতে চায়!’’ কথা বলার সময় মাথা নাড়লেন, যেন যুক্তি আরও জোরালো হয়।

ছোট ফুলপরি অবাক, আবারও মনে হল, এ কথায়ও যুক্তি আছে।

পাশে বসে ভোজনরসিক ওদের কথাবার্তা শুনে গোঁফে টান দিলেন—নিজের ছোট শেয়াল, সবসময় চমক দিতে পারে! ক্ষুধার্ত আত্মারা ভূতজগতে সবচেয়ে বৃহৎ, সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা প্রবল। তারা অনেক স্থানে বাস করে, কেউ কেউ মানুষের জগতে ছড়িয়ে আছে—কিন্তু মানুষের রক্ষাকর্তারা তাড়িয়ে দেয়, উন্মুক্ত প্রান্তরে ঘোরে। পুনর্জন্মের সুযোগ না থাকায়, মানুষের জগতে প্রবেশের লোভ প্রবল। এ শক্তি কাজে লাগাতে পারলে, যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ সহায় হবেন...

এ ভাবতে ভাবতে, সর্বনাশা ভোজনরসিকের চোখে হাসি ফুটে উঠল। মনে হল, এ জগৎ বুঝি আবার উত্তাল হতে চলেছে...