পর্ব ছাব্বিশ লিয়াং ঝু
ফেং ছুনমেই যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত, তখন সে ওয়াং লিহুয়ার কাছে নাচ শেখাত এবং এতে সে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিল। তার ওপর ওয়াং লিহুয়া তাকে একদিন বলেছিলেন, একজন শিল্পীকে সাহসিকতার সঙ্গে দর্শকদের সামনে দাঁড়াতে হয়।
আসেপাশের ছোট ছেলেমেয়েরা যখন খেলত, ফেং ছুনমেই তখন তাদের সামনে নাচ দেখাত। ছোটরা তো অপ্রীতিকর কিছু বোঝে না, তাই সে যখন নাচত, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে দেখত।
কখনও ফেং ছুনমেই যদি কারও অত্যাচারের শিকার হতো, তখন ঝাং গ্যাং তার পাশে দাঁড়াত। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ফেং ছুনমেই মায়ের বানানো সুস্বাদু খাবার ঝাং গ্যাংয়ের জন্য নিয়ে যেত। কিন্তু ঝাং গ্যাং বলত, ‘‘আমি খাবার চাই না, তুমি বরং আমাকে একটু নাচ দেখাও।’’
ফেং ছুনমেই বিনা দ্বিধায় নাচ দেখাত।
ছুনমেই যখন মাধ্যমিকে উঠল, তখন ওয়াং লিহুয়া বিদেশে চলে গেলেন। তাঁর কথা মনে পড়লেই পাঁচ বছরের নিবেদন, শ্রম, ভালোবাসা মনে পড়ত এবং ফেং ছুনমেইর মন ভারী হয়ে উঠত। তখনকার দিনে, সাধারণ চীনা মানুষের কাছে বিদেশ যাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো দূরের এক ব্যাপার। ছুনমেইর মনে হতো, এ জীবনে বোধহয় আর কোনোদিন ওয়াং লিহুয়াকে দেখা হবে না।
নাচতে গেলে তার মনে পড়ত প্রিয় শিক্ষিকার কথা, ক্ষয়িষ্ণু স্কুলের পুরনো সঙ্গীতঘরে, যেখানে তারা দুজন ঘাম ঝরিয়ে অনুশীলন করত। ওয়াং লিহুয়াকে ছাড়তে মন চাইত না ছুনমেইর, কারণ তাদের মধ্যে গভীর মনের বন্ধন ছিল। মা দুঝুয়ানের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, তাতে ছিল রক্তের টান; কিন্তু আত্মার স্তরে যেসব কথা, তা শুধু ওয়াং লিহুয়াই বুঝতেন।
মা দুঝুয়ান সারাদিন ভাবতেন কোন বাজারে সবজি সস্তা, কীভাবে এক পয়সা কম খরচ করা যায়, রাতে কী রান্না হবে কিংবা কীভাবে সাধারণ উপকরণ দিয়েই স্বামী-সন্তানদের পছন্দের খাবার বানানো যায়। ফেং ছুনমেই ছোট হলেও এসব বুঝত। সে জানত, শুধু স্মৃতিতে ডুবে থাকলে চলে না।
তাই মাধ্যমিকে ওঠার পর থেকে সে আর নাচত না। ফলে তার উচ্চমাধ্যমিকের সহপাঠীদের মধ্যে কেবল ঝাং গ্যাং জানত, ছুনমেই নাচতে পারে।
ছুই মিংমিংও শিল্পের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত ছিল; সে আগে প্রাদেশিক সংগীত ও নৃত্যদলের অনেক পারফরম্যান্স দেখেছে। প্রতিটি অনুষ্ঠানের শেষ আকর্ষণ ছিল ওয়াং লিহুয়ার নৃত্য, ‘‘লিয়াংশানপো আর ঝু ইংতাই।’’
ছুই মিংমিং ছুনমেইকে জিজ্ঞেস করল, ‘‘ফেং ছুনমেই, তুমি কি ‘লিয়াংশানপো আর ঝু ইংতাই’ পরিবেশন করতে পারো?’’ সে জানত ছুনমেই মেধাবী ও সৎ, মিথ্যে বলবে না। আর যদি সে ওয়াং লিহুয়ার ছাত্রী হয়, তাহলে নিশ্চয়ই এই বিখ্যাত পরিবেশনাটি সে জানে। ছুনমেইর মনে ভেসে উঠল ওয়াং শিক্ষিকার আত্মবিস্মৃত নৃত্যরূপ; সে একটু ঘোরের মধ্যে মাথা নাড়ল।
ছুই মিংমিং বলল, ‘‘ঠিক আছে, আজকের সংগীত শ্রবণ ক্লাসে আমরা শুনব ভায়োলিন কনচের্তো ‘লিয়াংশানপো আর ঝু ইংতাই’। তুমি তাহলে সবার সামনে পরিবেশন করবে।’’
ছুনমেইর মনে পড়ল শিক্ষক ওয়াংয়ের উপদেশ: ‘‘ছুনমেই, তুমি যখনই ‘লিয়াংশানপো আর ঝু ইংতাই’ পরিবেশন করবে, সেটা যেন সর্বোচ্চ নিখুঁতভাবে হয়।’’
সে বলল, ‘‘ছুই স্যার, আমার তো নাচের জন্য পাখা নেই।’’
ছুই মিংমিং সহপাঠী শু লিকে বলল, ‘‘শু লি, আমার অফিস থেকে একটা নাচের পাখা নিয়ে এসো।’’
শু লি ক্লাসের সাংস্কৃতিক দায়িত্বে, তাই স্বাভাবিকভাবেই এই দায়িত্ব পেল। তবে সে একেবারেই আগ্রহী ছিল না। আজ কী হচ্ছে? সে ভাবেনি ফেং ছুনমেই নাচ জানে, কারণ এই সময়ে নানা প্রতিভার আলাদা ক্লাস ছিল না। বাবা-মা যদি এই পেশার হন বা কেউ পেশাদার দলে থাকেন, না হলে এমন কেউ নাচত না। শু লি অনিচ্ছায় পাখা নিয়ে এসে ছুনমেইর হাতে ছুড়ে দিল।
ছুই মিংমিং সামনের সারির ছাত্রছাত্রীদের বলল, ‘‘ডেস্কগুলো একটু পেছনে সরাও।’’
ওয়াং লিহুয়ার ‘‘লিয়াংশানপো’’ নৃত্য ছুই মিংমিং খুব পছন্দ করত। সে চাইল ছুনমেইর জন্য বেশি জায়গা দিতে, যাতে ওয়াং লিহুয়ার সেই বিখ্যাত পরিবেশনা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে।
‘‘লিয়াংশানপো আর ঝু ইংতাই’’-এর করুণ, হৃদয়স্পর্শী সুর বেজে উঠল; ছুনমেই ধীরে ধীরে কাগজের পাখা মেলে ধরল, নাচের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করল স্পষ্ট ভালোবাসা-ঘৃণা, উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের এক কিশোরী ঝু ইংতাইকে।
মধুর সুরে ছুনমেইর চোখের সামনে ভেসে উঠল শৈশবের স্মৃতি—ওয়াং লিহুয়া কীভাবে তাকে নাচ শিখিয়েছিলেন। হঠাৎ তার মনে পড়ল আগের জন্মে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হবার পর, ঘরে ঘরে চলতে থাকা বিপর্যয়, নিজের কষ্টের জীবনও।
‘‘লিয়াংশানপো আর ঝু ইংতাই’’-এর সুর শুনে ছুনমেই চারপাশ ভুলে গিয়ে, নীরব শরীরী ভাষায় নিজের ভিতরের গভীর অনুভূতিগুলো প্রকাশ করল।
নাচ শেষ হলে ছুই মিংমিং বলল, ‘‘ওয়াং লিহুয়ার ছাত্রী হলে এমনই হওয়া উচিত।’’
এ সময় শিক্ষক-সহপাঠীরা উচ্ছ্বসিতভাবে হাততালি দিল।
তলায় শু লি চুপচাপ বলল, ‘‘ধুর, ঝামেলা!’’
ইয়ান শিক্ষক বললেন, ‘‘আগামীকাল আমাদের ক্লাসের দুটি পরিবেশনা হবে। একটা ছুনমেইর ‘লিয়াংশানপো’, অন্যটি লিন গোচিয়াং ও ছুনমেইর যুগল গান-নৃত্য ‘উটের ঘন্টার আওয়াজ’। ঠিক আছে, এবার পড়াশোনায় মন দাও।’’
বেল পড়ল। ক্রীড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াং তং ছুনমেইর ডেস্কের সামনে এসে বলল, ‘‘ফেং ছুনমেই, নববর্ষের অনুষ্ঠানে আমি গান গাইব, তুমি আমাকে নাচে সঙ্গ দেবে, কেমন?’’
ঝাং গ্যাং পিছন থেকে এসে তাকে লাথি মেরে বলল, ‘‘তুই আবার বাড়াবাড়ি করছিস কেন? চুপচাপ থাক, চল চল, বল খেলতে যাই।’’
লিন গোচিয়াংয়ের বাড়ি।
লিন গোচিয়াং খেতে খেতে বলল, ‘‘মা, আমাদের স্কুলে আগামীকাল ত্রিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান, স্যার বলেছে প্রাক্তন ছাত্র আর অভিভাবকেরাও আসতে পারবে।’’
ওয়াং পিং বললেন, ‘‘এই ক’দিন রোগী বেশি, আমি যেতে পারব না। না হলে একবার দেখতামই।’’
লিন গোচিয়াং বলল, ‘‘আমি কাল গান গাইব।’’
ওয়াং পিং কিছু বলার আগেই, লিন ঝিচেং বললেন, ‘‘তোমাদের ক্লাসে সমবেত গান?’’
ওয়াং পিং-এর মনেও এমনই ধারণা ছিল, কিন্তু স্বামী এভাবে বলায় তার ভালো লাগল না। তিনি বললেন, ‘‘ছেলে আমার, ও কি শুধু দলে গাইবে? তোমার মনে কি গোচিয়াংয়ের কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিভা নেই?’’
লিন গোচিয়াং বলল, ‘‘না, এটা সমবেত গান নয়।’’
ওয়াং পিং খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘‘ছেলে, বলো তো কী হবে।’’
লিন গোচিয়াং বলল, ‘‘সংগীত স্যার আমাকে উত্তর শানের লোকগান ‘সিন থিয়ান ইউ’ গাইতে বলেছেন।’’
ওয়াং পিং বললেন, ‘‘আমি তো জানতামই। ছেলে, তোমার মা ছেলেবেলায় গান-নাচে খুব ভাল ছিল, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সবসময় অংশ নিত।’’
লিন ঝিচেং বলল, ‘‘গাইবে না, এসব গাইতে হবে না।’’
ওয়াং পিং বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘‘লাও লিন, তুমি কেন আমার ছেলেকে বাধা দিচ্ছো? ও তো আমার সাংস্কৃতিক প্রতিভা পেয়েছে।’’
লিন গোচিয়াং বাবাকে বলল, ‘‘বাবা, ক্লাস টিচার ইয়ান স্যার বলেছেন, এটা নাকি আমাদের ক্লাসের সম্মানের ব্যাপার। যার নাম ওঠেছে, তাকেই যেতে হবে।’’
লিন ঝিচেং শুনলেন, স্যারের নির্দেশে ছেলেকে যেতে হবে, আর কিছু বললেন না।
ওয়াং পিং বললেন, ‘‘ছেলে, খাওয়া শেষ করো, মা-কে একটু গেয়ে শুনাও না।’’
লিন গোচিয়াং বলল, ‘‘না, আমি গাইব না। তুমি শুনতে চাও তো কাল স্কুলে এসো।’’
ওয়াং পিং বললেন, ‘‘মা তো ব্যস্ত, সময় কোথায়।’’
তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘গোচিয়াং, তুমি একাই গাইবে?’’
ওয়াং পিং একেবারে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এত বছরেও ছেলেটা কখনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি, শিক্ষক নিশ্চয়ই বুঝে শুনেই নির্বাচন করেছেন।
লিন গোচিয়াং বলল, ‘‘আমি গান গাইব, স্যার ফেং ছুনমেইকে নাচের জন্য রেখেছেন।’’
ওয়াং পিং বলল, ‘‘ফেং ছুনমেই, সে না কি তোমার সঙ্গে হাসপাতাল গিয়েছিলো? সে তো নাচতেও পারে?’’
লিন গোচিয়াং বলল, ‘‘অনেক সুন্দর নাচে, ওর শিক্ষক আগে প্রাদেশিক সংগীত ও নৃত্যদলে ছিলেন।’’
ওয়াং পিং জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘প্রাদেশিক সংগীত ও নৃত্যদলে কে ছিলেন? ওখানকার বিখ্যাতদের আমি সবাই চিনি।’’
‘‘ওয়াং লিহুয়া, আমাদের সংগীত স্যারও তাঁকে খুব পছন্দ করেন।’’