চতুর্থ অধ্যায়: জাঁকালো ধনাঢ্য ব্যক্তি
পেন্সিলটা কাগজের ওপর খসখস করে অর্ধেক পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা শেষ করল।
পূর্বজন্মে ছিয়ান দু-এর হাতের লেখা খুব একটা আহামরি ছিল না, আবার যে একেবারে জঘন্য ছিল তা-ও নয়। কিন্তু এই জন্মে ব্যাপারটা অন্যরকম। এই শরীরের মূল মালিক ছোটবেলা থেকেই তার দাদুর কাছে কড়া শাসনের মধ্যে বড় হয়েছে। তার হাতের ব্রাশের লেখা যে খুব উঁচু দরের শিল্পীদের পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা বলা না গেলেও, অন্তত প্রাথমিক পাঠটুকু যে আয়ত্তে ছিল তা বলাই যায়। পেন্সিল দিয়ে লেখার সময় হাত অনেক দ্রুত চলে, আর নিজের এই অপটু হাতেও লেখাটা দেখতে বেশ পরিচ্ছন্নই লাগছে।
কাগজে লেখা মূল বিষয়গুলো তিনটি পয়েন্টে গুছিয়ে নেওয়া হলো।
প্রথমটা হলো সবচেয়ে জরুরি—টাকা উপার্জন। টাকা জিনিসটা শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, এটা ছাড়া উপায় নেই। দরকারের সময় টাকার অভাবই সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ। মানুষ বেঁচে আছে অথচ হাতে টাকা নেই—এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কিছু হতে পারে না। ছিয়ান দু যদি কিছু না করে অলস জীবন কাটানোর সিদ্ধান্তও নেয়, তবুও অন্তত দশ-বারো বছর পর এই সি-হে-ইউয়ান (ঐতিহ্যবাহী চত্বর বাড়ি) যখন অনেক দামি হয়ে উঠবে, তখন তা বিক্রি করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার মতো কিছু পুঁজি তার দরকার। এর মাঝে যদি কোনো জরুরি প্রয়োজনে টাকার দরকার হয়, তবে অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের একটা সঞ্চয় থাকাটা একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া জীবনটা তো কষ্টে কাটানোর জন্য নয়, নতুন সুযোগ পাওয়া জীবনটাকে উপভোগ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অর্থের সংস্থান হওয়ার পর জীবনটাকে ভালোমতো উপভোগ করা। এই জন্মে সে কোনোভাবেই অন্যের অধীনে চাকরি করবে না—এ ব্যাপারে সে বদ্ধপরিকর। গত জন্মে মাত্র এক বছরের চাকরি তাকে মানসিকভাবে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিল। সেই ক্লান্তি আর অবসাদ এত গভীর যে তা ভোলার মতো নয়।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ। বিরাশি... না, সঠিক বলতে গেলে তিরাশি সালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় তাকে সফল হতেই হবে। এই সুযোগটা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না। তখনকার দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মান ছিল আকাশচুম্বী, পরিবারের একজন সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মানেই ছিল পুরো পরিবারের সম্মান বৃদ্ধি। তাছাড়া ছিয়ান দু-এর কাছে এই পরীক্ষার কঠিনতা পরবর্তীকালের তুলনায় তেমন কিছুই নয়। যদিও সে গত বছরই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছে, তবুও পুরনো পড়াশোনার ভিত্তিটা এখনো তার মাথায় আছে। এটাই তার বড় সুবিধা। আগামী ছয়-সাত মাস একটু পরিশ্রম করলে বেইজিং ইউনিভার্সিটি বা সিংহুয়া ইউনিভার্সিটিতে জায়গা করে নেওয়া খুব একটা অসম্ভব হবে না।
যদিও পরবর্তী প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের চোখে একটা অদ্ভুত সারল্য বা মূর্খতা দেখা যায়, কিন্তু এই সময়ে সেই ডিগ্রির গুরুত্ব অনেক। তাছাড়া ছিয়ান দু-এর সবচেয়ে বড় আত্মবিশ্বাসের জায়গা হলো, তার মস্তিষ্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ ও তীক্ষ্ণ, যা পড়াশোনায় অনেক সাহায্য করবে। সম্ভবত আত্মা স্থানান্তরের প্রভাবেই তার মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এসব ভাবতে ভাবতে ছিয়ান দু আরও এক লাইন লিখে ফেলল।
"শরীরচর্চা করতে হবে, একটা সুঠাম ও সুস্থ দেহ ধরে রাখতে হবে। অন্তত একটা ছোট লক্ষ্য তো থাক—একশো বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হবে!"
তার বর্তমান শরীরটা খুব একটা সবল নয়, বরং কিছুটা দুর্বলই মনে হয়।
শেষ লাইনটা লিখে সে পুরোটা একবার মন দিয়ে পড়ল। তারপর চুল্লিতে কয়লা দেওয়ার সময় কাগজটা ছিঁড়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। এই পুনর্জন্মের ঘটনাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন রহস্য, যা তাকে কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আগলে রাখতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্য শুধু একটা মূল্যবান ডিগ্রি অর্জনই নয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা মানেই ছিল নিশ্চিত সরকারি চাকরি। বেইজিং ইউনিভার্সিটির মতো জায়গা থেকে পাস করলে পড়াশোনা শেষে মোটামুটি ভালো কোনো দপ্তরে কাজ পাওয়া যেত। যদি সে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার পথ বেছে নেয়, তবে তার পূর্বস্মৃতির সুবাদে পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারবে। কোনো বড় কর্মকর্তার হাত ধরে বিশ বছর ধৈর্য ধরে কাজ করলে, একদিন বড় কোনো অঞ্চলের দায়িত্ব পাওয়াও অসম্ভব নয়।
কিন্তু শেষমেশ ছিয়ান দু মাথা নাড়ল। এই পথটা বড্ড কঠিন, প্রতি পদক্ষেপে সতর্ক থাকতে হয়। তার কাছে এই জীবন মানেই—অতিরিক্ত মানসিক চাপ। সে নিজের চরিত্র সম্পর্কে জানে, সে এই ধরনের কাজের জন্য জন্মায়নি। শুধুমাত্র 'চাটুকারিতা' বা 'চতুরতা'র বিষয়টাই তাকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।
"এর চেয়ে বরং একটা ডিগ্রি নিয়ে এই ভালো সময়ে কিছু টাকা কামাই করা যাক, একজন সাধারণ ধনী মানুষ হয়ে থাকাই ভালো।"
দুপুরের খাবারের পর চোখে ঘুম নেমে এল, ছিয়ান দু লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। দিবাস্বপ্নে সে তার দাদুকে দেখতে পেল। দাদু খুব মিনতি করে তাকে ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন। টাকা উপার্জনের একটা সীমা থাকা উচিত—'ছিয়ান দু' নামের মধ্যেই তো সেই অর্থ লুকিয়ে আছে। দাদুর এই শিক্ষা তার জীবনের সারকথা।
ঘুম ভাঙার পর সে দেখল দুপুর গড়িয়ে গেছে। জানলার ফাঁক দিয়ে বিকেলের রোদ এসে পড়েছে ঘরে। চুল্লির ওপর রাখা কেটলিটা শিস দিচ্ছে। সে উঠে এক কাপ চা ঢেলে নিল। খালি কাপটা হাতে নিয়ে উল্টে দেখল, তাতে লেখা 'কাংসি আমলের তৈরি'। আসল না নকল, কে জানে!
ছিয়ান দু উঠে সোজা প্রধান কক্ষের পশ্চিম পাশের ঘরে গেল। আলমারিটা সরিয়ে মেঝের পাথর সরাতেই একটা গোপন সুরঙ্গ বেরিয়ে এল, যা দিয়ে একজন মানুষ অনায়াসেই নামতে পারে। এটা সম্ভবত আগেকার দিনের এয়ার রেইড শেল্টার বা বাঙ্কার। টর্চ জ্বেলে সে দেওয়াল ধরে নিচে নেমে গেল।
নিচে একটা বাতি জ্বালাতেই পুরো জায়গাটা আলোকিত হয়ে উঠল। ঘরটাতে প্রচুর বই আর পুরনো জিনিসপত্র রাখা। সে সরাসরি টেবিলের ওপর রাখা চামড়ার বাক্সটার দিকে গেল। বাক্সটা খোলা ছিল, আর ভেতরে ছিল বাড়ির দলিলপত্র, রেশন কার্ডের মতো প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র। আর নিচে রাখা ছিল পাঁচটি চকচকে সোনার বার।
এগুলো দেখে ছিয়ান দু-এর শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল। দারিদ্র্যের ভয় তাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, এই সোনার ঝলকানি তাকে প্রায় অন্ধ করে দেওয়ার মতো। দলিলটা দাদুর নামে, সুস্থ হয়ে উঠলে স্থানীয় অফিসে গিয়ে দেখতে হবে কীভাবে নিজের নামে করা যায়। এছাড়াও সে প্রচুর নগদ টাকা আর রেশন কুপন খুঁজে পেল। সব মিলিয়ে এক হাজার চারশ বত্রিশ ইউয়ান ছয় মাও চার ফেন। এই সময়ে এই পরিমাণ টাকার ক্রয়ক্ষমতা অনেক।
সব গুছিয়ে নেওয়ার পর সে আবার ঘরে ফিরে এল। এই তো ভালো দিন শুরু হতে চলেছে! সে মনে মনে হিসেব করল, এখন তার বয়স সতেরো, ২০০০ সালে তার বয়স হবে সাঁইত্রিশ। ততদিনে এই বাড়িটার দাম যে কত বাড়বে, তা ভাবাই যায় না। সব মিলিয়ে তার ভবিষ্যৎ এখন বেশ উজ্জ্বল।